হাবিব সরোয়ার আজাদ ।
আড়াই বছরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পেরিয়ে গেছে আট বছর। তবুও সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার জাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ৭৫০ মিটার দীর্ঘ জাদুকাটা সেতুর কাজ শেষ হয়নি। নির্ধারিত সময়ের ছয় বছর পরও সেতুটি পড়ে আছে অসমাপ্ত। দীর্ঘ এই বিলম্বে প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্প বাস্তবায়ন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের তদারকি নিয়ে।
সুনামগঞ্জ এলজিইডি সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৮৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয়ে জাদুকাটা নদীর ওপর সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। টেন্ডারের মাধ্যমে কাজটি পায় তমা কনস্ট্রাকশন। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের মে মাসের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের ছয় বছর পরও পুরো কাজ শেষ হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, সেতুর সব পিলারের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ১৫টি স্প্যানের মধ্যে ১২টি এবং ৭৫টি গার্ডারের মধ্যে ৬০টির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সেতুর ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ শেষ করতে আরও এক বছর সময় প্রয়োজন।
প্রশ্ন হচ্ছে আড়াই বছরের একটি প্রকল্প আট বছরেও কেন শেষ হলো না?
দীর্ঘ সময় ধরে নির্মাণকাজ ঝুলে থাকলেও এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা মিলছে না। বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার পরও কাজ অসমাপ্ত রাখার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, শুরু থেকেই নির্মাণকাজে ধীরগতি ছিল। যথাযথ তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতির কারণেই প্রকল্পটি বছরের পর বছর ঝুলে আছে।
তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট এলাকার বাসিন্দা আবেগ রহমানসহ স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বলেন, এত দীর্ঘ সময়েও সেতুর কাজ শেষ না হওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। দ্রত কাজ শেষ করার পরিবর্তে বছরের পর বছর নির্মাণকাজ ঝুলিয়ে রাখায়, বার বার সময় বৃদ্ধি,ব্যায় বৃদ্ধি সহ সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
সেতুটি নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল শুধু একটি নদীর ওপর যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর অঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগ। জাদুকাটা সেতু চালু হলে তাহিরপুরসহ সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, সিলেট, রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ সহজ হবে। চার চাকার যানবাহন চলাচলের সুযোগও তৈরি হবে।
একই সঙ্গে তাহিরপুরের জাদুকাটা নদী, বারেকটিলা, শহীদ সিরাজ লেক, লাকমাছড়া, মানিগাঁও শিমুলবাগান, টাঙ্গুয়ার হাওর এবং ট্যাকেরঘাটের শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রী) এলাকায় পর্যটকদের যাতায়াত আরও সহজ হবে। পর্যটননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ার কথা।
শুধু পর্যটন নয়, সেতুটি চালু হলে পণ্য পরিবহনেও গতি আসবে। স্থানীয় তিনটি স্থল শুল্ক স্টেশন বড়ছড়া,চারাগাঁও, বাগলী দিয়ে আমদানি করা ভারতীয় কয়লা ও চুনাপাথর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন সহজ হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারেও সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সেতুর কাজ আটকে থাকায় জাদুকাটা নদী পার হতে হচ্ছে খেয়াতরীতে। একটি-দুটি নয়, একই নদীতে চারটি খেয়াঘাট ব্যবহার করে মানুষকে পারাপার হতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে ভোগান্তি ও ঝুঁকি।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জনগণের অর্থে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিনগুণ সময়েও কেন শেষ করা গেল না?
তাহিরপুর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বাসেত প্রকৌশলী লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নতুন করে অসমাপ্ত সেতুর নির্মাণকাজ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কার্যাদেশ পাওয়ার পর পুনরায় সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করবে।
অর্থাৎ আট বছর পরও সেতুটি পুরোপুরি চালু করতে জনগণকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশের জন্য। ফলে বহু প্রত্যাশিত জাদুকাটা সেতুর নির্মাণকাজ কবে শেষ হবে এবং কবে এর সুফল পাবেন মানুষজনের মধ্যে এ নিয়েই ফের তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
সিলেট/সুনামগঞ্জ -১৭-০৯-২০২৬
[জাতীয়][feat1]
recentposts



No comments: